আধুনিক কৃষকের দেশ চীন

Share

কয়েক বছর আগেও চীনা কৃষকদের সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল জমি, অভিজ্ঞতা ও শ্রম। জমি চাষ, বীজ বপন, আগাছা পরিষ্কার কিংবা ফসল কাটার মতো কাজের বড় অংশই করতে হতো মানুষের হাতে।

চীনের অনেক কৃষি অঞ্চলের চিত্র এখন অনেকটাই ভিন্ন।

একজন কৃষক মাঠে না গিয়েও ড্রোনের মাধ্যমে ফসল পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। স্যাটেলাইট ও সেন্সর থেকে পাওয়া তথ্য দিয়ে জমির অবস্থা বিশ্লেষণ করা যায়। বেইদৌ (BeiDou) স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থার সাহায্যে কৃষিযন্ত্র নির্দিষ্ট লাইনে চলতে পারে। আর স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র কয়েক ঘণ্টার কাজ অনেক কম সময়ে শেষ করতে পারে। এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু কৃষকের কাজের ধরন বদলায়নি; কৃষির উৎপাদনশীলতা, শ্রমের প্রয়োজন এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতিও বদলে দিচ্ছে।

মাঠে মানুষের জায়গা নিচ্ছে যন্ত্র

চীনের কৃষিতে প্রযুক্তির পরিবর্তন বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো যান্ত্রিকীকরণ। ২০২৪ সালে চীনের ফসল উৎপাদনের চাষ, বপন ও কাটার সামগ্রিক যান্ত্রিকীকরণ হার ৭৫.৬ শতাংশের বেশি পর্যায়ে পৌঁছেছে। অর্থাৎ কৃষির প্রধান কাজগুলোর প্রায় তিন-চতুর্থাংশের বেশি এখন যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন করার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।

প্রধান শস্যে এই হার আরও বেশি। গমের ক্ষেত্রে যান্ত্রিকীকরণ প্রায় ৯৮ শতাংশ, ভুট্টায় ৯২ শতাংশের বেশি এবং ধানে প্রায় ৮৯ শতাংশ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এর অর্থ, কৃষকের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি; বরং কাজের ধরন বদলেছে। আগে যেখানে কৃষকের বড় সময় ব্যয় হতো শারীরিক শ্রমে, এখন তার একটি অংশ চলে যাচ্ছে যন্ত্র পরিচালনা, পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায়।

একটি ড্রোন, এক ঘণ্টায় ৬.৬ হেক্টর

চীনের হেবেই প্রদেশের একটি কৃষি উদ্যোগের উদাহরণ প্রযুক্তির গতি কতটা বদলাতে পারে, তা দেখায়।
চীনের সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে একজন কর্মী কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন ব্যবহার করে ড্রোন পরিচালনা করে এক ঘণ্টায় প্রায় ৬.৬ হেক্টর জমিতে কীটনাশক ছিটাতে পারেন।

প্রচলিত পদ্ধতিতে কৃষককে জমিতে প্রবেশ করে হাতে বা প্রচলিত যন্ত্রের সাহায্যে কাজটি করতে হতো। ড্রোনের ক্ষেত্রে অপারেটর মাটিতে না নেমেও বড় এলাকার কাজ করতে পারেন। এখানে পরিবর্তনটি শুধু গতি নয়। এটি একই সঙ্গে— শ্রমের ধরন → শারীরিক শ্রম থেকে প্রযুক্তি পরিচালনা, কাজের পদ্ধতি → হাতে প্রয়োগ থেকে আকাশপথে প্রয়োগ, নজরদারি → চোখের পর্যবেক্ষণ থেকে ডেটা-নির্ভর পর্যবেক্ষণ, —এই পরিবর্তন তৈরি করছে।

ড্রোন এখন শুধু ছবি তোলে না

কৃষি ড্রোনকে শুধু আকাশ থেকে ছবি তোলার যন্ত্র হিসেবে দেখলে চীনের কৃষিতে এর ব্যবহারকে ছোট করে দেখা হবে।
ড্রোন দিয়ে ফসল পর্যবেক্ষণ, কীটপতঙ্গ ও রোগ শনাক্তকরণ এবং নির্দিষ্ট এলাকায় কৃষি উপকরণ প্রয়োগের মতো কাজ করা হচ্ছে। ২০২৪ সালে চীনে কৃষি কাজে ব্যবহৃত প্ল্যান্ট প্রোটেকশন ইঅ্যাভি এর সংখ্যা প্রায় ২ লাখের কাছাকাছি ছিল বলে বিভিন্ন কৃষিপ্রযুক্তি সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৪ সালে চীনের কৃষি ড্রোনগুলো সম্মিলিতভাবে ১৭৩ মিলিয়ন হেক্টরের বেশি জমিতে বিভিন্ন ধরনের কৃষি কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়েছে বলে একটি ২০২৫ সালের কৃষি-শিল্প প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ড্রোন এখন পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি নয়; বড় পরিসরের কৃষি কার্যক্রমের অংশ হয়ে উঠছে।

কৃষিযন্ত্র এখন শুধু যন্ত্র নয়, ‘স্মার্ট’ যন্ত্র

চীনের কৃষিতে আরেকটি পরিবর্তন হচ্ছে বেইদৌ নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেমের (বিডিএস) ব্যবহার।
চীনের হেবেই প্রদেশের একটি কৃষি এলাকায় স্মার্ট সিডারকে বেইদৌ স্যাটেলাইট নেভিগেশনের সঙ্গে যুক্ত করে পূর্বনির্ধারিত তথ্য অনুযায়ী ভুট্টার বীজ বপন করা হচ্ছে।

আগে কৃষককে জমির সারি ও দূরত্ব নিজের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে ঠিক করতে হতো। এখন যন্ত্রকে আগে থেকেই তথ্য দেওয়া যায় এবং সেটি সেই নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে পারে। ফলে কৃষির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হচ্ছে— অভিজ্ঞতা-নির্ভর কৃষি → তথ্য-নির্ভর কৃষি।

প্রযুক্তি এসেছে, উৎপাদনও বেড়েছে—তবে কারণ একমাত্র প্রযুক্তি নয়

চীনের কৃষিতে প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধির একটি সম্পর্ক দেখা যায়। তবে উৎপাদন বৃদ্ধিকে শুধু প্রযুক্তির ফল হিসেবে দেখলে বিষয়টি অতিরঞ্জিত হবে। জমির পরিমাণ, উন্নত জাত, আবহাওয়া, সেচ, কৃষিনীতি ও অন্যান্য কারণও গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চীনের মোট খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিল ৭০৬.৫ মিলিয়ন টন, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ১.৬ শতাংশ বেশি। একই সময়ে খাদ্যশস্যের গড় উৎপাদনশীলতা ছিল প্রতি হেক্টরে ৫,৯২১ কেজি, যা এক বছর আগের তুলনায় ১.৩ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ জমির পরিমাণ সামান্য বাড়লেও উৎপাদন বৃদ্ধির একটি অংশ এসেছে প্রতি ইউনিট জমিতে বেশি উৎপাদন থেকে। ২০২৪ সালে চীনের খাদ্যশস্য আবাদি জমি ছিল প্রায় ১১৯.৩২ মিলিয়ন হেক্টর।

কৃষকের কাজ: ‘হাতে কাজ’ থেকে ‘ডেটা দিয়ে সিদ্ধান্ত’

প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত এখানেই। আগে কৃষক সিদ্ধান্ত নিতেন মূলত— মাটির অভিজ্ঞতা দেখে, আবহাওয়া দেখে, ফসলের অবস্থা চোখে দেখে, স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরণ করে। স্মার্ট কৃষিতে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে- স্যাটেলাইট ডেটা, জিপিএস/ বেইদৌ নেভিগেশন, ড্রোনের ছবি, মাটির সেন্সর, আবহাওয়ার তথ্য, এআই ও বিগ ডাটা, স্বয়ংক্রিয় কৃষিযন্ত্র।

চীন ২০২৪–২০২৮ সালের জন্য যে স্মার্ট এগ্রিকালচার অ্যাকশন প্ল্যান নিয়েছে, সেখানে কৃষির পুরো ভ্যালু চেইনকে ডিজিটাল করার পাশাপাশি ডিজিটাল প্লান্টিং টেকনোলজি সিস্টেম এবং ন্যাশনাল এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল বিগ ডাটা প্লাটফর্ম তৈরির লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ ভবিষ্যতের কৃষক শুধু “কখন জমিতে যাবেন” তা জানবেন না; প্রযুক্তির মাধ্যমে “কখন কী করতে হবে” সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যও ডেটা পাবেন।

তাহলে কৃষকের জীবন কীভাবে বদলাচ্ছে?

একটি সাধারণ তুলনা করলে পরিবর্তনটি এমন— মানুষের শারীরিক শ্রম বেশি, মাঠে গিয়ে পর্যবেক্ষণ, হাতে বীজ বপন, হাতে/ প্রচলিত পদ্ধতিতে স্প্রে, অভিজ্ঞতাভিত্তিক, সিদ্ধান্ত, ছোট পরিসরে দ্রুত কাজ সীমিত, কৃষক প্রধানত শ্রমিক প্রভৃতি অংশীজন নিয়ে পুরোনো কৃষি পদ্ধতি অগ্রগসর হতো। আর বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার বেশি, ড্রোন ও সেন্সরের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হয়, জিপিএস/ বেইদৌ নির্ভর যন্ত্র, ড্রোন দিয়ে স্প্রে, ডেটা-সহায়িত সিদ্ধান্ত, বড় এলাকা দ্রুত পরিচালনার সুযোগ, কৃষক ধীরে ধীরে অপারেটর/ম্যানেজারে হিসেবে পরিচালনা করে থাকেন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে চীনের প্রতিটি কৃষক একই মাত্রায় প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। অঞ্চল, জমির আকার, ফসল ও বিনিয়োগের সক্ষমতার ওপর প্রযুক্তির ব্যবহার ভিন্ন হতে পারে।

আসল পরিবর্তন কোথায়?

চীনের কৃষিতে প্রযুক্তির গল্প আসলে ড্রোন বা রোবটের গল্প নয়। এটি কৃষির একটি মৌলিক রূপান্তরের গল্প। একসময় প্রশ্ন ছিল—“কতজন মানুষ দিয়ে কত জমিতে কাজ করা যাবে?” প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিতে প্রশ্নটি ধীরে ধীরে বদলে হচ্ছে— “কতটা জমি কতটা নির্ভুলভাবে, কত কম সময় ও সম্পদ ব্যবহার করে পরিচালনা করা যাবে?”

২০২৪ সালে চীনের খাদ্যশস্য উৎপাদন ৭০৬.৫ মিলিয়ন টনে পৌঁছানো এবং একই সময়ে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার দেখায় যে দেশটির কৃষি ক্রমেই শ্রমনির্ভর ব্যবস্থা থেকে যন্ত্র, ডেটা ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে।
কৃষক অবশ্যই মাঠে থাকবেন। কিন্তু ভবিষ্যতের মাঠে তার হাতে শুধু কাস্তে বা কোদাল থাকবে না—থাকবে স্মার্টফোন, ডেটা, ড্রোন এবং আধুনিক কৃষিযন্ত্র।

Share

সর্বশেষ সংযোজন

Related Articles

৭৭ বছরের ইতিহাস, পতাকার উৎসব আর কোটি মানুষের যাত্রা: চীনে শুরু গোল্ডেন উইক

১ অক্টোবর। চীনের জাতীয় দিবস। ১৯৪৯ সালের এই দিনে বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে...

চাঁদের উৎসব শেষ, আসছে গোল্ডেন উইক: চীনে ছুটির পর ছুটির আমেজ

চীনে শেষ হলো তিন দিনের মধ্য-শরৎ উৎসবের ছুটি। ২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর...

চীনে কার্গো জাহাজে ভয়াবহ আগুন, নিহত ২০

চীনের পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরনগরী কিংদাওয়ে একটি বিদেশি কার্গো জাহাজে ভয়াবহ আগুন লেগে অন্তত...

‘চীন-বাংলাদেশের একাডেমিক সম্পর্ক হাজার বছরের’

চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে একাডেমিক ও জ্ঞানভিত্তিক যোগাযোগের ইতিহাস প্রায় এক হাজার...