চীনের গ্রেট ওয়াল কি শুধুই একটি প্রাচীর?

Share

চীনের গ্রেট ওয়াল বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পাহাড়ের বুক চিরে হাজার কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ছুটে চলা এক বিশাল প্রাচীর। বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়কর স্থাপনা হিসেবে পরিচিত এই দেয়াল দেখতে প্রতিবছর ছুটে আসেন লাখো পর্যটক। কিন্তু গ্রেট ওয়ালকে যদি শুধু একটি দীর্ঘ প্রাচীর হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এর বিশাল ইতিহাসের একটি বড় অংশই অদেখা থেকে যায়। এর সবচেয়ে অজানা দিক হলো—গ্রেট ওয়াল আসলে কোনো একক দেয়াল নয়। এটি বিভিন্ন রাজবংশের সময়ে ধাপে ধাপে নির্মিত একটি বিশাল সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। দেয়ালের পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ওয়াচটাওয়ার, দুর্গ, সামরিক ঘাঁটি, সংকেত টাওয়ার, গিরিপথ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ।

ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ের নির্মাণকাজ মিলিয়ে গ্রেট ওয়ালের মোট দৈর্ঘ্য ২০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি। অর্থাৎ এটি শুধু একটি স্থাপনা নয়; বরং চীনের হাজার বছরের সামরিক কৌশল, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের এক বিশাল নিদর্শন।

গেট কতটি?

গ্রেট ওয়ালের ক্ষেত্রে ‘গেট’ বলতে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা বলা কঠিন। কারণ বিভিন্ন যুগে নির্মিত দেয়ালের সঙ্গে অসংখ্য পাস, দুর্গ ও প্রবেশপথ যুক্ত ছিল। ২০১৯ সালের চীনা সংরক্ষণ পরিকল্পনায় গ্রেট ওয়াল ব্যবস্থার সঙ্গে প্রায় ২ হাজার ২০০টি পাস ও দুর্গের তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছিল।
তবে পর্যটকদের কাছে পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রবেশপথ রয়েছে। এর মধ্যে বাদালিং, মুতিয়ানইউ, জুয়ংগুয়ান, সিমাতাই, জিনশানলিং, হুয়াংহুয়াচেং, গুবেইকৌ, শুইগুয়ান, শানহাইগুয়ান ও জিয়াইউগুয়ান অন্যতম।

বেইজিংয়ের আশপাশে থাকা বাদালিং, মুতিয়ানইউ, জুয়ংগুয়ান, সিমাতাই, হুয়াংহুয়াচেং, গুবেইকৌ ও শুইগুয়ান বর্তমানে পর্যটকদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়। প্রতিটি অংশের রয়েছে আলাদা স্থাপত্য, ভূপ্রকৃতি ও ইতিহাস।

পাহাড় থেকে সমুদ্র—এক প্রাচীরের বহু গল্প

গ্রেট ওয়ালের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি শানহাইগুয়ান। হেবেই প্রদেশের ছিনহুয়াংদাও এলাকায় অবস্থিত এই কৌশলগত পাসটি পাহাড় ও সমুদ্রের মধ্যবর্তী পথ নিয়ন্ত্রণ করত। এ কারণেই ইতিহাসে এটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

অন্যদিকে বেইজিংয়ের উত্তরে জুয়ংগুয়ান ছিল রাজধানী রক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা পাস। এর সঙ্গে বেইজিংয়ের উত্তরের সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বাদালিং অঞ্চলের প্রতিরক্ষা কাঠামোরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আর পশ্চিমে রয়েছে জিয়াইউগুয়ান। বর্তমান গানসু প্রদেশে অবস্থিত এই দুর্গ ও পাস ছিল প্রাচীন চীনের পশ্চিম সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রবেশপথ। একই সঙ্গে এটি ঐতিহাসিক বাণিজ্যপথের সঙ্গেও যুক্ত ছিল।

তাই গ্রেট ওয়ালের গল্প শুধু ইট-পাথরের একটি দীর্ঘ দেয়ালের গল্প নয়। কোথাও এটি পাহাড়ের গিরিপথ পাহারা দিয়েছে, কোথাও নিয়ন্ত্রণ করেছে মরুভূমির প্রান্ত, কোথাও নজর রেখেছে বাণিজ্যপথের ওপর।

হাজার বছর আগে নির্মিত এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আজ পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ। কিন্তু এর প্রতিটি গেট, দুর্গ ও ওয়াচটাওয়ার যেন বলে যায়—গ্রেট ওয়াল আসলে একটি দেয়াল নয়; এটি চীনের ইতিহাস, সামরিক কৌশল ও সভ্যতার এক দীর্ঘ পথচলার জীবন্ত দলিল।

Share

সর্বশেষ সংযোজন

Related Articles

যে শহরকে বলা হয় ‘নিষিদ্ধ নগরী’

চীনে এমন এক সুবিশাল রাজপ্রাসাদ রয়েছে, যাতে রয়েছে প্রায় ৯ হাজার ঘর।...

চীন ভ্রমণে যাচ্ছেন? জেনে নিন উল্লেখযোগ্য কিছু স্থানের কথা

চীন দেশটি ভ্রমণের জন্য চমৎকার স্থান। এখানকার পুরাতন শহর, জঙ্গল, মন্দির, ধান...

চীনের ৫টি দর্শনীয় স্থান

সাতশ’ বছরেরও বেশি আগে থেকে মার্কো পোলোর লেখার মাধ্যমে বিশ্বে প্রথম চীন...

চিনের এই ‘অবাস্তব’ মলে আছে ‘নিজস্ব’ মেট্রো! নামে হেলিকপ্টারও

অবস্থান পৃথিবীর ‘কেন্দ্রে’, রয়েছে ১৯৯টি লিফ্‌ট, ‘নিজস্ব’ মেট্রো! চিনের এই ‘অবাস্তব’ মলে...