কয়লার শহরকে সবুজে সাজিয়ে চীনের মাইলফলক

Share

‘শানসি’ নামে চীনের দুইটি প্রদেশ রয়েছে। এক ‘শানসি’র রাজধানী তিন হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী শহর শিয়ান। আরেক ‘শানসি’র রাজধানী তাইয়্যুয়েন। ঐতিহ্য তুলে ধরে মুগ্ধতা ছড়িয়ে দিতে চীন যে বেশ পটু তা মোটামোটি বিশ্বের সবাই কমবেশি জানে। তবে কয়লার খনিসমৃদ্ধ একটি শহর যেখানে গাছের কোনো বালাই নেই; কয়লার জন্য মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে যে শহর একাকার অবস্থা সেই শহরকে সবুজায়নে সাজিয়ে অনন্য এক নজির স্থাপন করেছে চীন সরকার। এই শহরটি হলো তাইয়্যুয়েনের শানসি প্রদেশের একটি নির্জন কয়লার শহর। শহরটির নাম চিনছেং। ইংরেজি বানানে Jincheng।

শহরটি শানসি প্রদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত। শহরটি প্রধানত কয়লা উত্তোলনের জন্য পরিচিত ছিল। তবে পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিক সবুজায়নের মাধ্যমে এটি এখন চীনের একটি অন্যতম মডেল সবুজ শহরের রূপ নিয়েছে। প্রথাগত কয়লা অঞ্চলের ধোঁয়া ও ধূলিময় ভাব কাটিয়ে শহরটি ২০১১ সালে চীনের শীর্ষ ১০টি অবসর কাটানোর শহরের একটি শহর হিসেবে তালিকাপ্রাপ্ত করা হয়। তারপর থেকেই বদলে যেতে থাকে শহরটির সৌন্দর্য।

সবুজায়নে বিপুল বিনিয়োগ

চিনছেং শহর কর্তৃপক্ষ পরিবেশের উন্নতির জন্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ২০০ মিলিয়ন ইউয়ানেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে। পরিত্যক্ত কয়লা খনি এবং পাহাড়ের অনাবাদী জমিতে গাছপালা ও ঘাস রোপণের মাধ্যমে শহরের মাথাপিছু সবুজ এলাকার পরিমাণ ১৫.৫ বর্গমিটারে উন্নীত করে কর্তৃপক্ষ।
শহরের প্রায় ৩৯ শতাংশ এলাকা বনভূমিতে আবৃত, যা পুরো শানসি প্রদেশের গড়ের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। শহরের উত্তরে ৬০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে বাইমাসি ইকো-জোন, যা শহরের ‘‘সবুজ হৃদপিণ্ড’’ নামে পরিচিত। এখানে কৃষি পর্যটন, বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং সংস্কৃতি চর্চার সুব্যবস্থা রয়েছে।
বর্তমানে শহরে ২৯টি সিটি পার্ক এবং উপকণ্ঠে ৭টি ফরেস্ট পার্ক রয়েছে। ৪,৪৭৫ কিলোমিটার মহাসড়কের পাশে এবং ৪৬০টিরও বেশি গ্রামে সবুজ বলয় তৈরি করা হয়েছে।

খনি মালিকদের ওপর প্রতি টন উত্তোলিত কয়লার জন্য পরিবেশগত কর আরোপ করা হয়েছে, যা দ্বারা সাধারণ কৃষক ও স্থানীয়দের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করা হয়।

বায়ুদূষণ প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা

দূষণ কমাতে শহরের কর্তৃপক্ষ ‘‘ব্লু-স্কাই ডেইজ’’ নামের বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। এর অধীনে ভারী দূষণকারী ১৫টি কারখানা বন্ধ বা স্থানান্তর করা হয়েছে।
২০০৮ সাল থেকে শহরটিতে বাসাবাড়ি ও যানবাহনে কয়লার পরিবর্তে তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন কয়লা-স্তরীয় মিথেন গ্যাস ব্যবহারে জোর দেওয়া হয়। বর্তমানে ১৫,৬৭০ টির বেশি পরিবার এবং ৯,০০০ যানবাহন পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহার করছে।

শহরের কার্বন নির্গমন কমাতে এবং ট্রাফিক সমস্যা মেটাতে ২.৩ বিলিয়ন ইউয়ান বিনিয়োগ করেছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি শহর পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োজিত রাখা হয়।

জীববৈচিত্র্য ও পর্যটন কেন্দ্র

তাইনহাং পর্বতমালার কাছে অবস্থিত চিনছেং প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। এটি শানসির অন্যতম প্রধান বন্যপ্রাণীর আবাস্থল। ইয়াংচেং কাউন্টির মাংহে নদী এবং কিনশুই কাউন্টির লিশান পর্বত অভয়ারণ্যে বিরল প্রজাতির বানর ও জায়ান্ট স্যালামান্ডার পাওয়া যায়।

শানসি প্রদেশের মোট রেশম উৎপাদনের ৮০ শতাংশই এই অঞ্চলে হয়। এছাড়া এখানে উইচি খেলার উৎপত্তিস্থল কিজি পর্বত অবস্থিত।
বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ

পরিবেশবান্ধব ও উন্নত নগর পরিবেশের কারণে শহরটিতে তাইওয়ানের ফক্সকন, সিনোপেক, পেট্রোচায়নার মতো আন্তর্জাতিক ও শীর্ষস্থানীয় জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ করছে এবং কারখানা স্থাপন করছে। পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করে নগর উন্নয়নে চিনছেং শহর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

Share

সর্বশেষ সংযোজন

Related Articles

৭৭ বছরের ইতিহাস, পতাকার উৎসব আর কোটি মানুষের যাত্রা: চীনে শুরু গোল্ডেন উইক

১ অক্টোবর। চীনের জাতীয় দিবস। ১৯৪৯ সালের এই দিনে বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে...

চাঁদের উৎসব শেষ, আসছে গোল্ডেন উইক: চীনে ছুটির পর ছুটির আমেজ

চীনে শেষ হলো তিন দিনের মধ্য-শরৎ উৎসবের ছুটি। ২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর...

আধুনিক কৃষকের দেশ চীন

কয়েক বছর আগেও চীনা কৃষকদের সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল জমি, অভিজ্ঞতা ও...

চীনে কার্গো জাহাজে ভয়াবহ আগুন, নিহত ২০

চীনের পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরনগরী কিংদাওয়ে একটি বিদেশি কার্গো জাহাজে ভয়াবহ আগুন লেগে অন্তত...