চীনের পূর্বাঞ্চলীয় আনহুই প্রদেশের শুয়ানচেং শহরের ছাটিং এলাকায় তামা ও সোনার একটি বিশাল খনিজ ভাণ্ডারের সন্ধান পাওয়া গেছে। দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই আবিষ্কার পূর্ব চীনে বৃহৎ আকারের একটি নতুন খনিজ সম্পদভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।
ইয়াংজি নদীর বদ্বীপ অঞ্চলের অভ্যন্তরে অবস্থিত এই খনিজ ভাণ্ডারটি একটি আগ্নেয় অববাহিকার নিচে রয়েছে। আন্তর্জাতিক ভূতত্ত্বে দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হতো, এ ধরনের ভূতাত্ত্বিক পরিবেশে বড় আকারের পোরফিরি-ধরনের তামার খনি গড়ে ওঠার সম্ভাবনা কম।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রধান আকরিক দেহটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১.২ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ১.১ কিলোমিটার। একটি মাত্র অনুসন্ধানী বোরহোলে এর সর্বোচ্চ দৃশ্যমান পুরুত্ব ১,৩৭১ মিটার পর্যন্ত পাওয়া গেছে।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এখানে সম্ভাব্য তামার মজুত এমন কয়েকটি বৃহৎ তামার খনির সমপরিমাণ হতে পারে, যেগুলোর প্রতিটির মজুত ৫ লাখ মেট্রিক টনের বেশি। একই সঙ্গে সম্ভাব্য সোনার মজুত ২০ টনের বেশি সোনার মজুত থাকা এক ডজনেরও বেশি বড় খনির সম্মিলিত পরিমাণকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তবে গভীর স্তরে থাকা আকরিকের পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান এখনো শেষ হয়নি। ফলে ভবিষ্যতে এই খনির আনুমানিক সম্পদ ও মজুত আরও বাড়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
তামা ও সোনার পাশাপাশি এখানে রূপা ও সালফারসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট খনিজও পুনরুদ্ধার ও ব্যবহার করা সম্ভব হবে। খনিটি পূর্ণাঙ্গভাবে উন্নয়ন করা হলে এটি পূর্ব চীনের একটি অতি-বৃহৎ তামা-সোনা উৎপাদন ঘাঁটিতে পরিণত হতে পারে।
প্রকল্পটির নেতৃত্বদানকারী চীনা প্রকৌশল একাডেমির সদস্য তাং জু-শিং এই আবিষ্কারকে ২০২৬-৩০ সালের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা সময়কালে খনিজ অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এটি পরিকল্পনার শুরুতেই একটি শক্তিশালী অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চীনা ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান একাডেমির খনিজ সম্পদ ইনস্টিটিউটের গবেষক তাং বলেন, এটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি পোরফিরি-ধরনের তামা-সোনার খনি, যেখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো এর উচ্চ সোনার ঘনত্ব।
চীনা ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান একাডেমির গভীর ভূগর্ভস্থ পূর্বাভাস ও সম্ভাব্যতা মূল্যায়ন গবেষণা কার্যালয়ের উপপরিচালক এবং প্রকল্পটির মাঠপর্যায়ের প্রযুক্তিগত প্রধান লিন বিন বলেন, এখন দলের প্রধান লক্ষ্য হলো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে মজুত বাড়াতে এবং যত দ্রুত সম্ভব উৎপাদন শুরু করতে সহায়তা করা।
তিনি বলেন, এসব লক্ষ্য অর্জন করা গেলে ইয়াংজি নদীর মধ্য ও নিম্ন অববাহিকা এবং পূর্বাঞ্চলীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলে তামা ও সোনার অভ্যন্তরীণ সরবরাহ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এর ফলে দেশের কৌশলগত খনিজ সম্পদ সরবরাহ আরও সুরক্ষিত হবে।
লিনের মতে, খনিটি উৎপাদনে গেলে পূর্ব চীনের তামা ও সোনা গলন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে সরাসরি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে দীর্ঘ দূরত্বে পরিবহনের ব্যয় কমবে এবং আমদানির ওপর নির্ভরশীলতাও হ্রাস পাবে। একই খনি থেকে রূপা ও সালফারের মতো অন্যান্য খনিজও আহরণ করা সম্ভব হওয়ায় এটি ওই অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বহুমুখী সম্পদকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
এই আবিষ্কার ভূতাত্ত্বিক গবেষণার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ, আন্তর্জাতিক ভূতত্ত্বে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ধারণা ছিল যে প্রসারণশীল আগ্নেয় অববাহিকায় বড় পোরফিরি-ধরনের তামার খনি তৈরি হওয়া কঠিন।
নতুন অনুসন্ধানের ফলাফল ইয়াংজি নদীর মধ্য ও নিম্নাঞ্চলে বৃহৎ আকারের তামা-সোনা খনিজায়নের সম্ভাবনা নিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে আনহুই ও জিয়াংসু প্রদেশের অন্যান্য আগ্নেয় অববাহিকাতেও একই ধরনের খনিজ অনুসন্ধানের সম্ভাবনা রয়েছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পূর্ব চীনের পুরু আগ্নেয় শিলা দ্বারা আচ্ছাদিত এলাকাগুলোতে খনিজ অনুসন্ধানের জন্যও এই আবিষ্কার নতুন পথ খুলে দিয়েছে। লিন জানান, ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সময় এসব এলাকায় ব্যাপক ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এই আবিষ্কারের পেছনে কেন্দ্রীয় সরকার, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ কাজ করেছে। আনহুই প্রাদেশিক প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যুরো ২০০৮ সাল থেকে ছাটিং এলাকায় ভূতাত্ত্বিক জরিপের জন্য সরকারি অর্থ বরাদ্দ শুরু করে এবং ২০১৮ সালে একটি জরিপ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।
২০২৫ সালে অনুসন্ধান অধিকার হস্তান্তরের জন্য প্রকাশ্য প্রক্রিয়া শুরু হলে Tibet Yulong Copper Co অক্টোবর মাসে ৮.৬ বিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ১.২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) দর দিয়ে ওই অধিকার পায়। এটি আনহুইয়ে একক খনন অধিকার লেনদেনের সর্বোচ্চ রেকর্ড।
চলতি বছর চীনের প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয় ছাটিং অনুসন্ধান প্রকল্পটিকে ২০২৬ সালের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। প্রাদেশিক, পৌর ও জেলা পর্যায়ের প্রাকৃতিক সম্পদ কর্তৃপক্ষও প্রকল্পটিতে সহযোগিতা করেছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান মাত্র চার মাসে মোট প্রায় ১ লাখ মিটার গভীরতার ৭১টি অনুসন্ধানী বোরহোল সম্পন্ন করেছে।
লিন বিন বলেন, চীনে বর্তমানে তামার চাহিদা ব্যাপক এবং আমদানিনির্ভরতা এখনো বেশি। তবে দেশের অভ্যন্তরে তামার নতুন সম্পদ অনুসন্ধানের সম্ভাবনাও অত্যন্ত বড়।
তিনি আরও জানান, চলতি বছর চীনের শিজাং (তিব্বত) অঞ্চলে চিহ্নিত তামার সম্পদের পরিমাণ ৭ কোটি টনের বেশি হতে পারে। ২০৩০ সালের শেষ নাগাদ এই পরিমাণ ১০ কোটি টনে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।