৭৭ বছরের ইতিহাস, পতাকার উৎসব আর কোটি মানুষের যাত্রা: চীনে শুরু গোল্ডেন উইক

Share

১ অক্টোবর। চীনের জাতীয় দিবস। ১৯৪৯ সালের এই দিনে বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর ২ ডিসেম্বর ১৯৪৯ সালে কেন্দ্রীয় সরকার ১ অক্টোবরকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় দিবস হিসেবে নির্ধারণ করে। আজ ২০২৬ সালে দেশটি উদযাপন করছে প্রতিষ্ঠার ৭৭তম বার্ষিকী।

জাতীয় দিবস তাই শুধু একটি সরকারি ছুটির দিন নয়। সাত দিনের ছুটি, কোটি মানুষের ভ্রমণ, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং বিপুল পর্যটন কর্মকাণ্ডের কারণে এটি চীনের বছরের অন্যতম বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সময়।

জাতীয় দিবস থেকে ‘গোল্ডেন উইক’

২০২৬ সালে ১ থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত চলছে সাত দিনের জাতীয় দিবসের সরকারি ছুটি। আর কয়েক দিন আগেই, ২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পালিত হয়েছে তিন দিনের মধ্য-শরৎ উৎসব।

দুই ছুটির মাঝখানে মাত্র তিন কর্মদিবস থাকায় কেউ কেউ ছুটি ও বার্ষিক ছুটি মিলিয়ে ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত ১৩ দিনের বিরতি তৈরি করেছেন। ফলে এবারের ছুটির মৌসুম শুধু সাত দিনের গোল্ডেন উইকে সীমাবদ্ধ নেই; অনেকের জন্য এটি দীর্ঘ ভ্রমণের সুযোগে পরিণত হয়েছে।

রেলস্টেশন থেকে বিমানবন্দর—বাড়ছে মানুষের ঢল

গোল্ডেন উইকের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে পরিবহন ব্যবস্থায়। চীনের রেলওয়ে ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত ১৬ দিনের বিশেষ পরিবহন সময় পরিচালনা করছে। যাত্রীচাপ সামলাতে অতিরিক্ত উচ্চগতির ট্রেন, রাতের ট্রেন ও বিশেষ সেবা যুক্ত করা হয়েছে।

বেইজিং রেলওয়ে অঞ্চলে এই সময়ে ২ কোটি ২৩ লাখের বেশি যাত্রী পরিবহনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ১ অক্টোবরকে ধরা হয়েছে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ যাত্রী চলাচলের দিন—শুধু সেদিনই প্রায় ১৭৯ লাখ যাত্রী পরিবহনের পূর্বাভাস রয়েছে।

জাতীয় পর্যায়েও ভ্রমণের পরিসর বড়। গত সপ্তাহে মধ্য-শরৎ উৎসবকে ঘিরে সরকার ৬৫ কোটির বেশি আন্তঃআঞ্চলিক যাতায়াতের পূর্বাভাস দিয়েছিল। এরপরই শুরু হয়েছে আরও দীর্ঘ জাতীয় দিবসের ছুটি।

এবার ভ্রমণ শুধু দেশের ভেতরেই নয়

গোল্ডেন উইকে চীনা পর্যটকদের মধ্যে দূরপাল্লার অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ ও বিদেশ ভ্রমণের প্রবণতাও বাড়ছে। চীনের অনলাইন ভ্রমণ প্ল্যাটফর্মগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ১০ দিন বা তার বেশি সময়ের ভ্রমণ মোট বুকিংয়ের প্রায় ২৬ শতাংশ। দুই হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের বুকিংও গত বছরের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেড়েছে।

বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ ভ্রমণের চাহিদা দেখা যাচ্ছে। স্পেন, গ্রিস, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক, আজারবাইজানসহ বিভিন্ন গন্তব্যে দীর্ঘমেয়াদি ভ্রমণ জনপ্রিয় হয়েছে।

চীনের জাতীয় অভিবাসন প্রশাসন জাতীয় দিবসের সাত দিনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২১ লাখ ৫০ হাজার সীমান্ত পারাপারের পূর্বাভাস দিয়েছে। ব্যস্ততম দিনে এই সংখ্যা ২৪ লাখ ছাড়াতে পারে।

সংস্কৃতি থেকে পর্যটন—গোল্ডেন উইকের আরেক চেহারা

জাতীয় দিবস এখন শুধু পতাকা উত্তোলন বা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শরৎভ্রমণ, ঐতিহ্যবাহী খাবার, রাতের বিনোদন, গ্রামভ্রমণ, শিক্ষামূলক ভ্রমণ ও স্থানীয় সংস্কৃতিভিত্তিক আয়োজন।
চীনের সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত একটি জাতীয় পর্যটন প্রচারাভিযান শুরু করেছে। দেশজুড়ে ২০ হাজারের বেশি সাংস্কৃতিক ও পর্যটন আয়োজন রাখা হয়েছে। পর্যটন ও ভোগব্যয় বাড়াতে বিভিন্ন স্থানীয় সরকার ৩১ কোটি ইউয়ানের বেশি ভোক্তা কুপন ও ভর্তুকি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।

এর সঙ্গে রয়েছে বড় অর্থনৈতিক প্রত্যাশাও। ২০২৫ সালের মধ্য-শরৎ ও জাতীয় দিবসের সম্মিলিত আট দিনের ছুটিতে চীনা পর্যটকেরা ৮৮ কোটি ৮০ লাখ অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ করেছিলেন এবং মোট ব্যয় করেছিলেন প্রায় ৮০৯ বিলিয়ন ইউয়ান।

বেশি পর্যটক মানেই কি বেশি খরচ?

এবারের গোল্ডেন উইকের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—মানুষ বেশি ভ্রমণ করলেও তারা ব্যয়ের ক্ষেত্রে তুলনামূলক সতর্ক।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের গোল্ডেন উইকে পর্যটনপ্রতি গড় ব্যয় ছিল প্রায় ৯১১ ইউয়ান, যা তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এবারের ছুটিতেও পর্যটকদের মধ্যে অর্থের বিনিময়ে বেশি মূল্য পাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিলাসবহুল থাকার চেয়ে মধ্যম মানের আবাসন ও মূল্যসাশ্রয়ী ভ্রমণ জনপ্রিয় হচ্ছে।
অর্থাৎ, গোল্ডেন উইকের গল্প এখন শুধু “কত মানুষ ভ্রমণ করল”—এতটুকু নয়; বরং “মানুষ কীভাবে এবং কতটা খরচ করে ভ্রমণ করছে”—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বদলাচ্ছে চীনের পর্যটনের ধরন

আরেকটি পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে ভ্রমণের অভিজ্ঞতায়। পর্যটকরা শুধু বিখ্যাত স্থান দেখে ফিরে আসার বদলে বিশেষ অভিজ্ঞতা, কম পরিচিত শহর ও স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হতে চাইছেন।

এবারের ছুটিতে ফ্লিগির তথ্য অনুযায়ী, হিমবাহে হাঁটার বুকিং প্রায় ৫০ শতাংশ, আকাশ থেকে ঝাঁপ দেওয়ার বুকিং প্রায় ৮০ শতাংশ এবং তিমি দেখার বুকিং ২০০ শতাংশ বেড়েছে। কম পরিচিত জেলা ও ছোট শহরগুলোর প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে।

একটি জাতীয় দিবস, একটি বিশাল সামাজিক আয়োজন

১ অক্টোবরের জাতীয় দিবসের কেন্দ্রে রয়েছে ১৯৪৯ সালের ইতিহাস। কিন্তু ৭৭ বছর পর এই দিনটি চীনের বর্তমান সমাজ ও অর্থনীতিরও একটি বড় প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

একদিকে তিয়েনআনমেন স্কয়ারে জাতীয় পতাকা, অন্যদিকে রেলস্টেশনে মানুষের ভিড়; কোথাও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কোথাও পর্যটনকেন্দ্রে ব্যস্ততা; কেউ পরিবারের কাছে ফিরছেন, কেউ দেশের অন্য প্রান্তে যাচ্ছেন, আবার কেউ পাড়ি দিচ্ছেন বিদেশে।
জাতীয় দিবসের ইতিহাস শুরু হয়েছিল একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণার মধ্য দিয়ে। ৭৭ বছর পর সেই দিনটি এখন একই সঙ্গে ইতিহাসের স্মৃতি, জাতীয় দিবসের উদযাপন এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বার্ষিক ভ্রমণ ও পর্যটন মৌসুমের একটি অংশ।

চীনে তাই আজ শুধু ১ অক্টোবর নয়—আজ থেকে শুরু হলো সাত দিনের এমন এক সময়, যখন একটি দেশের ইতিহাস, মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, পর্যটন ও অর্থনীতি একসঙ্গে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

Share

সর্বশেষ সংযোজন

Related Articles

চাঁদের উৎসব শেষ, আসছে গোল্ডেন উইক: চীনে ছুটির পর ছুটির আমেজ

চীনে শেষ হলো তিন দিনের মধ্য-শরৎ উৎসবের ছুটি। ২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর...

আধুনিক কৃষকের দেশ চীন

কয়েক বছর আগেও চীনা কৃষকদের সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল জমি, অভিজ্ঞতা ও...

চীনে কার্গো জাহাজে ভয়াবহ আগুন, নিহত ২০

চীনের পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরনগরী কিংদাওয়ে একটি বিদেশি কার্গো জাহাজে ভয়াবহ আগুন লেগে অন্তত...

‘চীন-বাংলাদেশের একাডেমিক সম্পর্ক হাজার বছরের’

চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে একাডেমিক ও জ্ঞানভিত্তিক যোগাযোগের ইতিহাস প্রায় এক হাজার...