চীনে শেষ হলো তিন দিনের মধ্য-শরৎ উৎসবের ছুটি। ২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিবার, ভ্রমণ, ঐতিহ্য ও উৎসবের আমেজে কেটেছে দিনগুলো। কিন্তু একটি ছুটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চীনে শুরু হয়েছে আরেক বড় ছুটির প্রস্তুতি। ১ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে জাতীয় দিবসের সাত দিনের ‘গোল্ডেন উইক’।
অর্থাৎ, চীনের জন্য সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ—পরিবার, ভ্রমণ, পর্যটন ও ভোগব্যয়ের এক দীর্ঘ ব্যস্ত মৌসুম।
৬৫ কোটি যাতায়াতের পর এবার আরও বড় ভ্রমণ
মধ্য-শরৎ উৎসবের তিন দিনে চীনে আন্তঃআঞ্চলিক মানুষের যাতায়াত ৬৫ কোটি ছাড়ানোর পূর্বাভাস ছিল। দৈনিক গড় যাতায়াত ছিল প্রায় ২২ কোটি। ২৭ সেপ্টেম্বর ছুটির শেষ দিনে শুধু রেলপথেই প্রায় ১ কোটি ৬৮৬ লাখ যাত্রী পরিবহনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
এই স্বল্পমেয়াদি ছুটিতে শহরের আশপাশে ভ্রমণ, গ্রামভ্রমণ ও রাতের পর্যটন ছিল বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু এবার সামনে সাত দিনের জাতীয় দিবসের ছুটি থাকায় ভ্রমণের ধরনও বদলাচ্ছে।
চীনের ভ্রমণ প্ল্যাটফর্মগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এবারের দীর্ঘ ছুটিতে ১০ দিন বা তার বেশি সময়ের ভ্রমণও জনপ্রিয় হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গন্তব্যে বিমান বুকিংও গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে ২ হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের বুকিং ১৪ শতাংশ বেড়েছে।
১ অক্টোবর থেকে সাত দিনের গোল্ডেন উইক
জাতীয় দিবস উপলক্ষে ১ থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত চীনে সরকারি ছুটি থাকবে। এবার মধ্য-শরৎ উৎসব ও জাতীয় দিবসের ছুটির মাঝে মাত্র তিন কর্মদিবস থাকায় অনেকে দুই ছুটিকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘ ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন। এতে কারও জন্য ছুটির সময় কার্যত আরও দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে।
শুধু পর্যটক নয়, পরিবহন ব্যবস্থার ওপরও এর বড় প্রভাব পড়ছে। ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত চীনের রেলওয়েতে বিশেষ ভ্রমণকাল ধরা হয়েছে। এই সময়ে যাত্রীদের চাপ সামলাতে অতিরিক্ত ট্রেন ও বিশেষ সেবা চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
চীনের রেলপথে ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেই যাত্রী পরিবহন হয়েছে ৩.৩২ বিলিয়ন ট্রিপ, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩.৯ শতাংশ বেশি। এই সময়ে প্রতিদিন গড়ে ১১,৫০৮টি যাত্রীবাহী ট্রেন চলেছে।
দেশের বাইরে যাওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে
গোল্ডেন উইক শুধু চীনের অভ্যন্তরীণ পর্যটনের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক ভ্রমণের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সময়।
চীনের জাতীয় অভিবাসন প্রশাসনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ১–৭ অক্টোবর জাতীয় দিবসের ছুটিতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২১ লাখ ৫০ হাজার আন্তর্জাতিক যাত্রী সীমান্ত পারাপার করতে পারেন। ব্যস্ততম দিনে এই সংখ্যা ২৪ লাখ ছাড়াতে পারে।
২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে চীনের সীমান্তে মোট আগমন ও বহির্গমন হয়েছে ৪৯ কোটি ৯০ লাখ, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮.৭ শতাংশ বেশি। একই সময়ে বিদেশি নাগরিকদের সীমান্ত পারাপারও বেড়েছে।
উৎসব এখন পর্যটন ও অর্থনীতিরও বড় চালিকা শক্তি
মধ্য-শরৎ উৎসবের চাঁদের পিঠা, পারিবারিক মিলন ও ঐতিহ্যবাহী আয়োজন থেকে গোল্ডেন উইকের পর্যটন—দুই উৎসবই এখন চীনের সেবা ও ভোগ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চীনের সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবরজুড়ে দেশব্যাপী ২০ হাজারের বেশি সাংস্কৃতিক ও পর্যটন আয়োজন করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকারগুলো ৩১ কোটি ইউয়ানের বেশি ভোক্তা কুপন ও ভর্তুকি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
আয়োজনের তালিকায় রয়েছে শরৎকালীন ভ্রমণ, পারিবারিক ভ্রমণ, গ্রামভ্রমণ, সাংস্কৃতিক পর্যটন, রাতের বিনোদন, খাবার ও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিভিত্তিক নানা আয়োজন।
এর পেছনে রয়েছে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও। ২০২৫ সালের মধ্য-শরৎ ও জাতীয় দিবসের সম্মিলিত আট দিনের ছুটিতে চীনা পর্যটকেরা ৮৮ কোটি ৮০ লাখ অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ করেছিলেন এবং মোট ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৮০৯ বিলিয়ন ইউয়ান।
এবার ভ্রমণের ধরনও বদলাচ্ছে
এবারের দীর্ঘ ছুটিতে শুধু বিখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখাই লক্ষ্য নয়। ভ্রমণকারীদের মধ্যে অভিজ্ঞতাভিত্তিক, দীর্ঘমেয়াদি ও অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত গন্তব্যে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
ভ্রমণ প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, হিমবাহে হাঁটা, আকাশ থেকে ঝাঁপ দেওয়া, তিমি দেখার মতো বিশেষ অভিজ্ঞতাভিত্তিক ভ্রমণের বুকিংও বেড়েছে। এমনকি কম পরিচিত জেলা ও ছোট শহরগুলোও পর্যটকদের আকর্ষণ করছে।
এটি চীনের পর্যটন অর্থনীতিতে একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়—মানুষ এখন শুধু “কোথায় যাব?” তা নয়, বরং “কী অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরব?”—সেটিও গুরুত্ব দিচ্ছে।
এক উৎসব থেকে আরেক উৎসব
মধ্য-শরৎ উৎসব চীনের মানুষকে পরিবার ও শিকড়ের কাছে ফিরিয়ে আনে। গোল্ডেন উইক তাদের সামনে খুলে দেয় দীর্ঘ ভ্রমণ, নতুন শহর, নতুন অভিজ্ঞতা ও বিনোদনের সুযোগ।
এই দুই ছুটির মাঝখানে তাই শুধু ক্যালেন্ডারের কয়েকটি দিন নয়; দেখা যাচ্ছে চীনের পরিবহন ব্যবস্থা, পর্যটন শিল্প, স্থানীয় ব্যবসা, খাবার, বিনোদন ও ভোগব্যয়ের এক বিশাল চলাচল।
চাঁদের আলোয় শুরু হওয়া উৎসবের আমেজ এবার ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে গোল্ডেন উইকের ব্যস্ততায়। একদিকে পরিবার ও ঐতিহ্য, অন্যদিকে পর্যটন ও আধুনিক ভোগসংস্কৃতি—চীনের এই ছুটির মৌসুম যেন দেশটির সমাজ ও অর্থনীতির একটি চলমান প্রতিচ্ছবি।